টাইবেরিয়াস সীজারের রাজত্বকালে জুডিয়াতে তরুন বয়সের পয়গাম্বর জিসাসের আবির্ভাব হয়। তিনি ছিলেন কপর্দকহীন যাজক, নিজেকে প্রতিশ্রুত মসিহ ভাবতেন। কেবল ভিক্ষাবৃত্তি অবলম্বন করে রৌদ্রতপ্ত ধূলিময় জুডিয়ায় ঘুরে বেড়াতেন। সাধু জনের হাতে দিক্ষীত হয়ে পুর্বতন ইহুদি ধর্মযাজকদের ধারায় তিনি ধর্ম প্রচার করতেন। তিনি গভির আকর্ষণী-শক্তি-বিশিষ্ট, সহজ-বিনয়ী, ব্যক্তিত্বের অধিকারী মানুষ ছিলেন।
তিনি তাঁর অনুচরদের আকৃষ্ট করতেন, প্রেম ও সাহস দিয়ে তাদের হৃদয় পূর্ণ করতেন। দূর্বল ও অসুস্থ লোক তার উপস্থিতিতে আশান্বিত হতেন। বাইবেল ও কুরআনের বর্ণনা মতে তিনি অতিপ্রাকৃতিক শক্তির অধিকারী ব্যক্তি ছিলেন। ঈশ্বরের পিতৃত্ব ও মানুষের ভ্রাতৃত্বের নামে তিনি শুধু পারিবারিক বন্ধনের মুলেই আঘাত করেন নি বরং তিনি অর্থনৈতিক স্তর, ব্যক্তিগত সম্পদ ও সুবিধাকে ঘৃনা করতেন। তিনি বার বার ব্যক্তিগত সম্পদ ও স্বতন্ত্র ব্যক্তিগত জীবনকে ঘৃনা করিতেন।
একজন তাহাকে বলিল ‘ দেখুন আপনার মাতা ও ভ্রাতাবৃন্দ আপনার সাথে বাক্যালাপ করার জন্য বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন। উত্তরে তিনি বললেন ‘ কে আমার মাতা, কে আমার ভ্রাতা ? শিষ্যদের দিকে হাত বাড়িয়ে তিনি বললেন , আমার মাতা ও ভ্রাতাদের দেখো। যে কেহ আমার স্বর্গীয় পিতার আদেশ অনুযায়ী কাজ করিবে সে-ই আমার মাতা, আমার ভ্রাতা ও আমার ভগ্নী।
একজন পদপ্রান্তে নতজানু হয়ে জিজ্ঞাসা করিলেন, মহান প্রভু ,আমাকে বলুন কি করে আমি অমর জীবনের অধিকারি হতে পারি? জিসাস বললেন, তুমি আমাকে মহান বলে সম্বধন করো না। শুধু ঈশ্বরই মহান। তুমি অনুজ্ঞাগুলি জানো। ব্যভিচার করো না, প্রবঞ্চনা করো না, পিতা-মাতাকে শ্রদ্ধা করিও। ভক্ত উত্তর দিলো, প্রভু আমি এগুলো অনুশিলন করে আসছি। জিসাস বললেন, তোমার একটি জিনিসের অভাব আছে; তুমি ফিরে যাও, যা তোমার আছে তা বিক্রি করে দরিদ্রদের দান কর, স্বর্গে তুমি ঐশ্বর্য লাভ করবে। তার পর আইস ও ক্রুশ নিয়ে আমাকে অনুসরন করো।
যিশু ধনি শিষ্যদের উদ্দেশ্যে বললেন, যারা ধনি তারা কদাচিৎ ঈশ্বরের রাজত্বে প্রবেশ করিবে। শিষ্যগন বিস্মিত হলেন, যিশু পুনরায় বলিলেন ‘ একজন ধনি ব্যক্তির ঈশ্বরের রাজত্বে প্রবেশ করা অপেক্ষা সূচের ছিদ্র দিয়ে একটি উটের প্রবেশ করা অধিকতর সহজ।’তিনি ছিলেন প্রচলিত আচার বিরোধি। ফারিসিগন (নিষ্ঠাবান ইহুদি) তাহাকে প্রশ্ন করিল গুরুজন প্রদর্শিত পথে কেন আপনি শিষ্যদের নিয়ে চলেন না এবং কেন অধৌত হাত দ্বারা আপনি আহার করেন? তিনি উত্তর করিলেন, আইজায়া তোমাদের ন্যায় কপট ব্যক্তিদের সম্পর্কে যথার্থ বলেছেন ‘ এই ব্যক্তিগন আমাকে তাহাদের অধর দ্বারাই মান্য করে, কিন্তু তাদের হৃদয় আমা হইতে অনেক দূরে।’ তোমরা ঈশ্বরের আদেশগুলো ছেড়ে পাত্র ও বাটি ধৌত করার সংস্কার ধরে রেখেছো। জিসাসের রাজ্যের উজ্জল প্রভায় কোনো সম্পত্তি, কোনো সুবিধা, কোনো অহংকার, কোনো পূর্ববর্তিতা থাকবে না এবং প্রেম ছাড়া কোন অভিপ্রায় বা পুরস্কার থাকবে না।
পুরহিতরা বুঝেছিল যে, এই এক ব্যক্তি অথবা পুরোহিতের বিনাশ ছাড়া দ্বিতীয় কোন পথ নেই। পুরোহিতরা সম্রাটকে বুঝালেন তার প্রেমের বাণী রাষ্ট্রের শান্তি-শৃঙ্খলা নষ্ট করতে পারে, নতুন রাজ্যের জন্ম দিতে পারে। বার শিষ্যের কোন একজন মাত্র একটি পেনির বিণিময়ে জিসাসকে পুলিশের হাতে তুলে দিলেন। আদালত তাঁকে এবং দুইজন তস্করকে একসাথে মৃত্যুদণ্ডদেশ দিয়েছিলেন। বলা হয়, নিয়মমতো যখন বদ্যভুমিতে জিসাস নিজের ক্রোশ বয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি মুর্ছিত হয়ে পড়েন। মনে হয় তিনি খুবই দুর্বল শরীরের অধিকারী ছিলেন কারন ক্রোশবিদ্ধ হওয়ার অল্প সময়ের মধ্যে তার জীবনাবসান হয়।
জিসাস বলতেন ছুটির দিনে (সাবাত) শষ্যের শীষ ছিড়া অন্যায় নয়, তবে তোমার শত্রুদের ঘৃনা করা অন্যায় । তিনি অনেক কিছুকে খুব বেশি সরলিকরন করেছিলেন যেমন তিনি বলতেন, ‘অশুভকে প্রতিরোধ করোনা’ ‘দুশমন তোমার বাম গালে চপেটাঘাত করলে ডানগাল পেতে দিও’। এ ধরনের কথা খ্রিষ্টের জন্মের পাঁচশত বৎসর আগে লাও্য ৎসে ও বুদ্ধ বলেছিলেন। জিসাস বলেন ‘ নিজেকে বিচার না করে অপরকে বিচার করতে যেওনা।’ ‘ তাকে তাই দাও যা সে তোমার কাছে চাইছে আর তাকে যা ধার দিয়েছো তা ফিরিয়ে নিওনা।’ তিনি এতটা সন্যাস ছিলেন যে শিষ্যকে বলেন ‘ যদি তোমার হাত তোমাকে বিরক্ত করে তাহলে তা কেটে ফেল , দু হাতের জন্য যদি সেই নরকে যেতে হয়, যার আগুন কখনও নিবেনা, উষ্ঞতা কখনও হ্রাস পায়না, তপ্ততা কখনও ঠাণ্ডা হয়না, তার থেকে অনেক ভাল দুহাত কেটে অঙ্গহীনতার জীবন যাপন করা। যারা তার কথা শোনেনি তাদের তিনি বলতেন ‘ওরে শয়তানগ্রস্থ , ওরে বিষধর সর্পের বংশধর, তোরা কি নরকের করাল গ্রাস থেকে রক্ষা পাবি? যারা পবিত্র আত্মার বিরুদ্ধে কথা বলবে তারা এ জগতে যেমন স্থান পাবেনা, তেমনি আগত জগতেও স্থান পাবেনা। জিসাসের মৃত্যুর পর সেন্ট পল ও অন্যান্য শিষ্যরা তার বাণি সংগ্রহ করেন এবং তার মাঝে দেবত্বরোপ করেন। তার শিষ্যরা অপেক্ষা করতে থাকেন যে জিসাস আবার তাদের মাঝে ফিরে আসবেন ও স্বর্গরাজ্য প্রতিষ্ঠা করবেন।
