abmshafiullah.com

রোজা: ব্যক্তিক উন্নয়নের সুন্দরতম প্রশিক্ষণ

রোজা একটি প্রাচীন ধর্মাচার ও জীবন পরিবর্তনকারী প্রশিক্ষন। প্রাচীনকাল থেকে ব্যক্তির মানসিক উন্নয়নের লক্ষ্যে বিভিন্ন ধর্মে রোজার অনুশিলন হয়ে আসছে। কুরআন অনুসারে মুসলিম কালচারে রোজার লক্ষ্য হলো তাকওয়া অর্জন করা। কুরআন বলছে ‘ তোমাদের জন্য রোজা ফরজ করা হলো যেমনি করে তোমাদের পুর্ববর্তীদের উপর ফরজ করা হয়েছিল যাতে তোমরা মুত্ত্কী হতে পারো’।

 

তাফসীরকারগন তাকওয়া শব্দের অনুবাদ করেন খোদাভীরুতা। খোদাভীরুতা অনুবাদটি তাকওয়ার যথাযথ মর্মার্থ প্রকাশ করে না। আরবি অভিধানে তাকওয়া শব্দের অর্থ আরও ব্যাপক। আরবি অভিধানে এই শব্দটি সংযত থাকা, রক্ষা করা, বেছে বেছে চলা, সতর্ক থাকা, To be mindful of God, to be wary about something ইত্যাদিকে আন্তভুক্ত করে।  কুরআনের ২:১৮৩ আয়াত অনুসারে রোজার রাখার লক্ষ্য হলো সংযম অর্জন করা, controll over himself, যোক্তিক মানুষ হিসাবে নিজেকে গঠন করা। নিজেকে আধ্যাতিক ও নৈতিক উন্নয়নের সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছে দেয়া। লাগাতার ৩০ দিন  রমজান মাসের রোজার অনুশিলনের মাধ্যমে  ব্যক্তি আরও পরিপূর্ণ মানুষে রূপান্তরিত হতে পারে।

 

 ইতিহাস থেকে জানা যায়,  পয়গাম্বর দাউদ আ. সন্তানের সুস্থতার জন্য ৭ দিন, পয়গাম্বর মুছা আ. মিশরের জনমানুষের মুক্তির জন্য সিনাই পর্বতে ৪০ দিন ও পয়গাম্বর ঈসা আ. রুহানি উন্নয়নের জন্য মরুভূমিতে ৪০ দিন লাগাতার রোজা রেখেছিলেন। অন্যদিকে যুবরাজ সিদ্ধার্থ ধ্যানের উন্নতির জন্য, সেনেকা ও সিসিরো মানসিক পারঙ্গমতা বৃদ্ধির জন্য দীর্ঘ সময় উপোস থাকতেন। এই প্রথা প্রাচীন যুগে চীন, পারস্য, গ্রীস, বাগদাদ, মিশর, ভারত ও আরবে প্রচলিত ছিল।

 

রোজা  আসলে কি ?

 

রোজা মানে সকাল-সন্ধা শুধু পানাহার থেকে বিরত থাকা নয়

 রোজা মানে জনন কার্যক্রম ও ভোগ থেকে বিরত থাকা নয়,

  রোজা বরং তার চেয়ে অনেক বেশি কিছু।

  রাসুল স. বলেন, ‘রোজা ঢাল স্বরুপ’ ইহা মানুষকে অপরাধ ও গোনাহ থেকে রক্ষা করে।

 

 রোজা মানে বাজে কথা না বলা

 রোজা মানে বাজে কথা না শোনা

 রোজা মানে বাজে চিন্তা না করা

 রোজা মানে খারাপ কিছু না করা

 

কুরআন মরিয়মকে বলছে ‘ খাও, পান কর ও চক্ষু জুড়াও। আর কাউকে দেখলে তুমি বলবে আমি আল্লাহর জন্য রোজার মানত করেছি , আমি আজ কোন মানুষের সাথে কথা বলবো না।’ ( কুরআন ১৯:২৭) তাই হজরত মরিয়ম আ. কারও সাথে কথা না বলাও এক ধরনের রোজা।

 

 রোজা মানে সংকীর্ণতার উর্ধ্বে উঠা

 রোজা মানে শৃংখলার মাঝে থাকা

 রোজা মানে নিজেকে সুন্দর মানুষ হিসাবে তৈরী করা।

 রোজা মানে নিজেকে শাসন করার কৌশল শিখা

 রোজা মানে সেল্প ডিসিপ্লিন

 

 রোজায় বেশি খাবার খাবেন না। ইফতারির প্লেট বাহারি খাবার দিয়ে সাজাবেন না। ফেইজবুকে বাহারি ইফতারের ছবি পোষ্ট দিবেন না। লোকদেখানো সকল কাজ ঈমান ও আমল নষ্ট করে। ইহা রোজার মেসেজের বিপরিত। পয়গাম্বর মুহম্মদ স. ইফতার ও সেহরী খুব অল্প আইটেম দিয়ে করতেন। মুহম্মদ স. কে অনুসরন করুন।

 

রাসুল বিলাসি জীবন যাপন করতেন না। রাসুল স. খাবারের সময় উদরের তিন ভাগের এক ভাগ খালি রাখতেন। মুহম্মদ স. এর স্ত্রী আয়েশা রা. বলেন ( রমজান মাস ছাড়া অন্যান্য মাসেও রাসুল স. কম খেতেন)  ‘রাসুল জীবনভর এত কষ্ট করেছেন যে, পরপর দুবেলা তিনি পেটভরে খাবারও খান নাই। তিনি খেতে পারতেন, কিন্তু সহগামী জনমানুষের চিন্তা করে তিনি পেট ভরে খাবারও খান নাই।

 

 হজরত আয়েশাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল যে, রাসুলের আখলাক সম্পর্কে কিছু বলুন। তিনি বলেছিলেন ‘খুলুকুহু কুরআন’ ‘কুরআন হলো রাসুলের আখলাক’। কুরআন বিশ্ব ক্লাসিকের মাষ্টার পিস। দরিদ্রতম আরব জাতিকে তা বদলে দিয়েছিল। সারা বিশ্ব বদলে দিয়েছিল। মুসলমানরা কুরআন পড়লো না, কুরআনের হৃদয়ের কথা শুনলো না। তাই রাসুলকে বুঝতে বেশি বেশি কুরআন পড়ুন। নিজেকে বদলাতে কুরআন পড়ুন। তা আপনাকে আপাদ-মস্তক বদলে দিবে। মুসলিম উম্মাহর কুরআন বুঝা একটি জরুরি কাজ। অবহেলা করবেন না। রাসুলকে যেন বলতে না হয় যে, ‘হে আল্লাহ আমার উম্মত এ কুরআনকে পরিত্যাগ করেছিল।’

 

 রমজানের সামাজিক গুরত্ব অনেক। তারবীর নামাজ, খতমুল কুরআন, একসাথে ইফতার, মাহফিল ও আলোচনা সভা ইত্যাদি কারনে মানুষের মাঝে সমতা ও ভ্রাতৃত্বের অনুভূতি জাগ্রত হয়। রমজানে ‘সবাই ভাই ভাই’। গনসংযোগ, কুশল বিনিময়, সামাজিক মেলামেশা ইত্যাদির মাধ্যমে বন্ধন আরও দৃঢ় করা যেতে পারে। সমাজের উপর তলা ও নীচতলার দূরত্ব কমানো যেতে পারে।

 

ব্যতিক্রমধর্মী ঘটনা ছাড়া, অধিকাংশ ক্ষেত্রে উপবাস মানুষের শারীরিক উপকার করে থাকে।  বিজ্ঞানও বলছে যে, নিয়মিত উপোস থাকা শরীরের সেলের সেলুলার লেভেলে গুরত্বপূর্ণ রিপিয়ারিং করে থাকে। শরীর ও মন সুন্দর রাখে। এ ক্ষেত্রে অটোফেজির কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। ধর্মে অবিশ্বাসী অনেক মানুষ, শুধু শারীরিক উপকারিতার জন্য উপবাস ব্রত পালন করে থাকেন। রোজার মাসে শৃঙ্খলা ও নিয়মনিষ্ঠার কারনে শারীরিক সুস্থতা বেড়ে যায়। মনো-দৈহিক শক্তি বাড়ে ও  দৃষ্টি তীক্ষতর হয়। 

 

সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব তৈরীর পাশাপাশি রমজান মাসের ফিতরা-সাদাকা মানুষের অভাব দূরিকরনে গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। জাকাতের মতো রোজার ফিতরা প্রদানও একটি বাধ্যতামূলক অর্থনৈতিক ঈবাদাত। রমজানের রোজা দারিদ্র্যতা মুক্ত সমাজ ও অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে জোরদার করে। বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে রোজার মাঝে অর্থনৈতিক কার্যক্রম বেড়ে যাওয়ায় দেশের অর্থনীতি গতিশীল হয়। পরিশেষে বলা যায় যে, সার্বিক দৃষ্টিকোন থেকে রমজান মাসের রোজা সবার জন্য অত্যন্ত উপকারী। মানুষ ইচ্ছা করলে রোজার অনুশিলনের মাধ্যমে সংযত, সুন্দর ও পরহেজগার মানুষে রূপান্তরিত হতে পারে। যে পারলো না তার চেয়ে হতভাগা আর কেউ হতে পারে না।

 ১লা রমজান, হিজরি ১৪৪৬

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top