abmshafiullah.com

সুদ ও মুছলিম সমাজ: একটি পর্যালোচনা

পুরো বিশ্বের অর্থব্যবস্থা সুদ ভিত্তিক। দেশি ব্যাংক, বিদেশি ব্যাংক, বিশ্বব্যাংক, আন্তরজাতিক মুদ্রা তহবিল, দেশের ভিতর-বাহির অর্থনৈতিক লেনদেন, জিপিএফ, সঞ্চয়পত্র ইত্যাদি সবই সুদভিত্তিক। এই সুদ ভিত্তিক অর্থব্যবস্থার আরম্ভ খৃষ্টের জন্মের অনেক আগে।  অর্থবাজার, বিনিয়োগ, ভোগ, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ইত্যাদি ক্ষেত্রে সুদ গুরত্বপূর্ণ ভ’মিকা পালন করে।

সুদ কি?
১. অর্থনীতিবিদের মতে সুদ হলো cost of borrowing money or the return on investment for lending money. It is typically expressed as a percentage of the pricipal amount over a specific period.  সহজ কথায় সুদ হলো সুনির্দিষ্ট সময়ের টাকার ব্যবহার মুল্য। সুদ নানা ধরনের হয়ে থাকে যেমন Nominal Interest, Real interest, Simple Interest and Compound interest.  ইসলামি পরিভাষায় সুদকে ‘রিবা’ বলা হয়। আরবি রিবা শব্দের অর্থ হলো বৃদ্ধি। টাকা বা সম্পদের ব্যবহার মুল্যের অযোক্তিক ও আনজাষ্ট বৃদ্ধি হলো সুদ। Riba refers to any form of unjust, exploitative gain often trnslated as `usury’ or `interest’  ইসলামিক স্কলারগন সুদকে দুইভাগে ভাগ করেন ১. রিবা-আল-নাসিআ: (interest charged on loan, where repayment is deferred with an additional sum ২. রিবা- আল- ফদল : unequal  exchange of commodities of the same type.  তারা ঋনের উপর আরোপিত সুনিদিষ্ট পরিমান লাভকে বা একই পণ্য বা দ্রব্যের অসম বিনিময়কে সুদ হিসাবে চিহ্নিত করেন, যেমন ঋনদাতা কোন ব্যক্তিকে ১০০ টাকা বা ১ কেজি চাল ধার দিয়ে ঋনগ্রহন কারীর কাছ থেকে সুনিদিষ্ট সময় পরে ১০৫ টাকা বা ১.৫ কেজি চাল ফেরত নিলেন। ১০০ টাকা বা ১ কেজি চালের ব্যবহারের উপর ৫ টাকা বা ০.৫ কেজি চাল সার্ভিস চার্জ হিসাবে নিলেন। ইহাকে ইসলামি পণ্ডিতগণ সুদ বলেন।

২. কুরআন-বাইবেল-তওরাহ সুদ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। এরিষ্টটল, প্লেটো, জিসাস মুহম্মদ স. থমাস একুইনাস, কার্লমার্কস, সিসিরো ও মহাত্মা গান্ধি সুদের বিরোধিতা করেছেন। প্রথমে খৃষ্টানরা সুদকে এতটা ঘৃনা করতো যে সুদখোরকে তারা তাদের কবরস্থানে কবর দিতে অনুমতি দিত না। গতানুগতিক মুসলমানরাও সুদকে ঘৃনা করেন। ৬ষ্ট শতাব্দীতে মক্কা-মদিনা-তাইফ-এ ইহুদিরা নন-ইহুদীদের সাথে, মুশরিকরা মুশরিক ও নন মুশরিকদের সাথে, নবসৃস্ট মুসলিম সমাজ বিদায় হজের আগে চড়া সুদে দিনার বা অন্য কোন দ্রব্য লেনদেন করতেন। বাজারের দূরাবস্থা, কাজে স্পৃহা হারাবার আশংকা ইত্যাদি দেখে প্রথমে ক্যালভিন এবং পরে প্রটেস্টান্ট ধর্মবেত্তাগন সুদকে হালাল ঘোষনা করেন। ১৫ শতকে সাধু টমাস একুইনাস সুদকে পূণসংজ্ঞায়িত করেন। মুহম্মদ স. সুদ খাওয়াকে মায়ের সাথে ব্যভিচার সম গোনাহ হিসাবে চিহ্নিত করে সুদখুরকে অভিশাপ দিয়েছেন। স্কিপচারে আপনি সুদের সরাসারি কোন সহজ-সরল সংজ্ঞা পাবেন না। পরে মুসলিম পÐিতগণ সুদের বা রিবার সংজ্ঞা তৈরী করেছেন। ইহার অধিকাংশ তৈরী হয়েেেছ নবম শতাব্দীতে বা মজহাবগুলো সৃষ্টির পর। এই বিষয়ে পÐিতগনের অনেক ভুল বুঝাবুঝি আছে। সুদের ক্ষতিকর ও শোষণমুলক বৈশিষ্টকে বিবেচনায় রেখে কুরআন সুদভিত্তিক লেনদেনকে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। (কুরআন ২:২৭৫, ২৭৮-২৭৯, ৩০:৩৯)

মধ্যযুগে সুদ
বাংলাদেশের সমাজে মহাজনি সুদ ও ব্যাংকিং সুদ এই দুই প্রকারের সুদি লেনদেন চলমান দেখা যায়। জিসাসের আগে বা পরের সমাজে বা আরবে প্রাতিষ্ঠানিক সুদ ভিত্তিক বিনিয়োগ ব্যবসার সিষ্টেম ছিল না। আরব-রোম-গ্রীস সর্বত্র সুদের হার ছিল গ্রাম বাংলার মহাজনি সুদি ধরনের, যাতে ঋণগ্রহিতা নি:শ^ হয়ে যেতেন। ধনি ব্যক্তি গরিব ব্যক্তিকে উচ্চ মুনাফা নিয়ে ধার দিতেন। তাতে দিন বা মাস শেষে লোন গ্রহিতা আরও ঋনগ্রস্থ হয়ে পড়তেন।মহাজনি সুদের হার ও ব্যাংকিং সুদের হারের তুলনায় অনেক বেশি, তারা সুদের হিসাব বৎসরে বা মাসে না করে বরং দৈনন্দিন ভিত্তিতে করতেন। এধরনের সুদী কারবার বাংলাদেশ, ভারত, আফ্রিকায় দেখা যায়। গবেষকরা দেখিয়েছেন যে, ভারত, বাংলাদেশ ও আফ্রিকার কিছু কিছু এলাকায় এক দিনের জন্য মহাজনেরা ১০০ টাকায় ৪ টাকা সুদ ৪ নেন। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী পুজির অভাবে চড়া সুদে টাকা ধার নিয়ে থাকেন। সন্ধায় টাকা সুদসহ ফেরত দেন। আরব-সিরিয়া-তাইফ-ইয়ামনে রাসুলের সময় মহাজনি ধরনের সুদীলেনদেন খুব চালু ছিল। পেশাকে প্রমোট করার জন্য, উদ্যোক্তা সৃষ্টির জন্য, মানুষকে কর্মক্ষম করা ও অর্থনীতিকে গতিশিল করার জন্য গোত্র সমাজে করজে হাসানা দেয়ার বিধান হয়তো খুব কম ছিল। বাইতুলমাল কনসেপ্টটি আধুনিক ব্যাংকের মত ছিল না। ইহার এলাকাও ক্ষুদ্র ছিল।

ব্যাংকিং ব্যবস্থা: ব্যাংক নিজের টাকা ও পরের টাকা দিয়ে পুঁজি গঠন করেন। সে অল্প সুদে মানুষের কাছ থেকে টাকা গ্রহন করে এবং বেশি সুদে মানুষকে টাকা ধার দেয়। টাকা দেয়া ও নেয়া হলো এবং মানুষের জমাকৃত টাকার নিরাপত্তা বিধান ব্যাংকের বিজনেজ। তবে মহাজনি সুদের মত ব্যাংকাররা এতটা নিষ্ঠুর নন। সে উদোক্তাদের জন্য অল্প সুদে উন্নয়ন কাজ বা কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য, প্রকল্প সৃষ্টির জন্য ঋণ দেন। এটা আসলেই একটি ভাল কাজ এবং শোষনের হার মহাজনি ঋনের তুলনায় অনেক কম। ব্যাংকের সবচেয়ে খারাপ দিক হলো, যার কোন সম্পদ নাই তাকে সে কোন রকমের ঋণ বা সাহায্য দেয় না। যার অনেক আছে, তাকে সে অনেক ঋণ দেয়। এ ক্ষেত্রে গ্রামীন ব্যাংক, ব্রাক, আশা ও অন্যান্য অর্থ লেনদেনকারী এনজিও একটু ব্যতিক্রম। তারা যার একবারে কিছুই নাই তাকেও জামানত ছাড়া চড়া সুদে ঋণ দেন। আরবে এই ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক কোন ঋণের ব্যবস্থা ছিলনা। সুদ ভিত্তিক ঋণদান মানুষকে যে কিছুটা উপকার করতে পারে এটা তাদের ভাবনায় ছিলনা।

সুদের শাস্তি:
কুরআন (০৩:১৩০) বিশ^াসিদের চক্রবৃদ্ধিহারে সুদ খেতে নিষেধ করেছেন। রাসুল বিদায় হজের ভাষণে তাঁর চাচা হামজার রা. এর প্রাপ্যসুদ বাতিল করেছিলেন। রাসুল নিজে সুদদাতা, সুদগ্রহীতা ও মধ্যস্বত্বের উপর অভিসম্পাত করেছেন এবং সুদ খাওয়াকে মায়ের সাথে ব্যভিচার সম গুনাহের কাজ ভেবেছেন। আল্লাহ (২:২৭৯) কুরআনে মানি লেন্ডারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা দিয়েছেন। ইসলামে সগিরা-কবিরা সকল গুনাহই ইহলোকে বা পরলোকে শাস্তিযোগ্য। কুরআন সুদখুরদের পরলোকে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা রেখেছেন এবং ইহজীবনে তিরষ্কার করেছেন। চুরি, ব্যভিচার, মদ পান, মেয়েদের উপর তহম্মত লাগানো অপরাধের মত সুনিদিষ্ট শাস্তির বিধান সুদখুরদের জন্য নাই। সম্ভবত সুদি ব্যবস্থা এতটা শক্তিশালী ছিল যে তাকে পরিহার করলে অর্থনীতি কলাপস করতো।

খলিফাদের সময়ে: হজরত উমর রা. সুদভিত্তিক যে কোন ধরনের লেনদেন বাতিল করতে কর্মকতাদের হুকুম দিয়েছেন। জনসমক্ষে সুদদাতা-গ্রহিতাদের তিরষ্কার করতেন, অর্জিত অবৈধ মুনাফা বাজেয়াপ্ত করতেন, গ্রহিতা পক্ষকে সুদসহ মুল ফিরিয়ে দিতেন, পুনরায় কেহ সুদভিত্তিক লেনদেন করলে জরিমানা এবং প্রয়োজনে বাণিজ্য থেকে অব্যাহতি দিতেন।

উমাইয়া ও আব্বাসি শাসনামলে সুদ বিষয়টি রাষ্টীয় আইনের আওতায় আসে। বিচারকগন সুদ জড়িত চুক্তি বাতিল করতেন, ক্ষতিপুরণ আদেশ দিতেন এবং আইন অমান্যকারীদের শাস্তির আওতায় আনতেন। পরবর্তি সময়ে শরিয়া কোর্ট সুদ ব্যবস্থাকে বাতিল করার চেষ্টা করেছেন। তারা সুদখুরদের সামাজিকভাবে বয়কট করেছেন, ব্যবসায় বিভিন্ন রকমের বাঁধা আরোপ করেছেন।

পাকিস্থানের পানজাবে ‘ দা পান্জাব প্রহিবিশান অব ইনটারেষ্ট অন প্রাইভেট লোন এক্ট ২০২২ ধারা ভঙ্গের ক্ষেত্রে ৩ থেকে ১০ বছরের শাস্তির বিধান রয়েছে। তাছাড়া পাকিস্থানের ফেডারেল কোর্ট সরকারকে ২০২৭ এর ভিতরে সকল ক্ষেত্রে সুদবিহীন অর্থনীতি প্রয়োগের নির্দেশ দিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে আফগানিস্থানের কথা উল্লেখ করা যায়, তাদের সংবিধান বলে ‘ ঘড় ষধি ংযধষষ পড়হঃৎধাবহব ঃযব ঃবহবঃং ধহফ ঢ়ৎড়ারংরড়হং ড়ভ ঃযব যড়ষু ৎবষরমরড়হ ড়ভ ওংষধস রহ অভমধহরংঃধহ’ আফগান সরকার গতানুগতিক ব্যাংকিং এর জায়গায় সুদবিহীন অর্থনীতি পরিচালনের প্রচেষ্টা করছেন।

সুদ এক অনিবার্য পাপ
পৃথিবীতে সুদমুক্ত অর্থনীতির প্রচারণা শুধু মুসলমান আলেম সমাজ করে থাকেন। সাধারণত বাংলাদেশ, পাকিস্থান, ভারত, আফ্রিকার মহফিলগুলোতে মওলানারা পরলোকে সুদের ভিষণ শাস্তির কথা বলেন। বড়বড় সেকুলার অর্থনীতিবিদরা ইসলামী অর্থনীতি বলে একটি বিষয় আছে এটা মানতেই নারাজ। বিগত হাজার বছর যাবৎ ধর্মসমাজ ইহার বিরোধিতা করেছেন, আখিরাতে অনেক শাস্তির কথা উল্লেখ করে রেফারেন্স দেন। কিন্তু সুদমুক্ত অর্থনীতির ঠিকসই মডেল এখন পর্যন্ত দাঁড় করাতে পারেন নি। পারলেও কিভাবে পুজিবাদের বিপরিতে বাস্তবায়ন করবেন তা জানেন না। বর্তমানে সুদী অর্থনীতি পুরো বিশ^কে ডমিনেট করছেন। বিশ^ব্যাংক, দেশি ব্যাংক, আন্তজাতিক মুদ্রা তহবিল ইত্যাদি, তাদের সকল কার্যক্রম সুদ ভিত্তিক। পুরো মুসলিম বিশে^র আর্ন্তজাতিক লেনদেন সুদভিত্তিক। প্রশ্ন হলো সুদবিহীন অর্থনীতির ধারক-বাহকরা সুদি ব্যবস্থার বিপরিতে সুদবিহীন অর্থব্যবস্থা আসলেই পেরে উঠবেন কি না? 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top