abmshafiullah.com

সক্রেটিসের শেষ জবানবন্দি:

ফেব্রুয়ারী, ৩৯৯ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ, এথেন্স

 

 

এথেন্সবাসীগন! আমি জানিনা আমার অভিযোগকারীগণ কীভাবে আপনাদের প্রভাবিত করতে সক্ষম হয়েছে। আমার বিরুদ্ধে বন্ধু মেলিটাস, এ্যনিটাস ও তার মিত্রদের অভিযোগ ‘আমি অদ্ভুদ ধরনের দুষ্কর্মের জনক, যুবসমাজের বিভ্রান্তকারী, নাস্তিক, কোন দেবতায় বিশ্বাস করিনা, আকাশচারী, স্বর্গ-মর্ত্য নিয়ে কথা বলি, মন্দকে ভাল বলে প্রমান করি এবং সবাইকে আমার তত্বে বিশ্বাসী করে তুলি।’ আরিষ্টোকিনাস তার নাটকে ‘সক্রেটিস’ নামক চরিত্রের সৃষ্টির মাধ্যমে এই সমস্ত গুজব রটিয়েছে। সে- এই- সকল গুজবের প্রণেতা। একেবারেই এ সমস্ত অভিযোগ ভিত্তিহীন। আমি আকাশচারী নই, নাস্তিকও নই, বিশেষত প্রাকৃতিক গবেষণার ক্ষেত্রে আমি একেবারেই অজ্ঞ। বিচরকক্ষের অনেকেই এই সত্যকে স্বীকার করবেন। আমি পেশাদার শিক্ষক নই, শিক্ষাদানের বিনিময়ে কারও কাছে আমি অর্থ গ্রহন করিনা এবং মানুষের কল্যানের নিমিত্ত আমি রাজণীতি থেকে সরে এসে ব্যক্তিগত জীবন বেচে নিয়েছি।

 

 

 

কিন্তু সক্রেটিস তোমার বিরুদ্ধে এত অভিযোগের কারন কি? নিশ্চয় তুমি অদ্ভুদ কিছু করেছো। তুমি সাধারন মানুষ হলে তোমার নামে এত গুজব রটতো না। সম্মানিত বিচারকবৃন্দ, আমার দূর্নামের মুল কারনটি আপনাদের কাছে ব্যাখা করছি। এথেন্সবাসিগন! আপানারা জানেন, লোকে আমাকে বিজ্ঞ বলে জানে যদিও কথাটি সত্য নয়। চারেফেন একদা ডেলফির দৈবজ্ঞের নিকট উপস্থিত হয়ে প্রশ্ন করলো: বলুন ‘সক্রেটিসের চেয়ে অধিক জ্ঞানী কেউ আছে কি? দৈবজ্ঞ জবাব দিলেন, ‘না, অধিক জ্ঞানী কেউ নেই’ চারেফেন পরলোকে গমন করেছেন। কিন্তু বিচারকক্ষে উপস্থিত তার ভ্রাতা অবশ্যই এ কথার সত্যতা স্বীকার করবে। আমি অবাক হয়ে নিজেকে প্রশ্ন করলাম। দৈবজ্ঞ তার জবাব দ্বারা কি বুঝাতে চাইছেন। আমিতো জানি ক্ষুদ্র কিংবা বৃহৎ কোন জ্ঞানই আমার নেই। তিনি দেবতা, তিনি তো মিথ্যা বলতে পারেন না। দেবতার কথা পরীক্ষার জন্য আমি একজন রাজনীতিজ্ঞকে বেচে নিলাম। তার সাথে আলাপ করে এ সিদ্ধান্ত না নিয়ে পারলাম না যে, লোকে যদিও তাকে জ্ঞানী ভাবে এবং তিনি নিজেকে তার চেয়ে বেশি জ্ঞানী মনে করেন। আমি তাকে বুঝিয়ে দিলাম প্রাজ্ঞবর, যদিও আপনি নিজেকে জ্ঞানী মনে করেন কিন্তু আপনি সত্যিকার জ্ঞানী নন। তিনি ও তার সাঙ্গপাঙ্গ আমার শত্রুতে পরিনত হলেন। দৈববাণীর মর্মার্থ আমাকে বুঝতে হবে। তাই কবি ও শিল্পির সাথে কথোপকতনে বুঝতে পারলাম যে, তারাও জ্ঞানি নন। তারা শুধু জ্ঞানের ভান করছেন। কবি কি বলছেন, অনেক সময় তিনি নিজেও বুঝেন না। আমি সারমেয়র নামে শপথ করে বলছি, ‘আমি দেখলাম যারা জ্ঞানী বলে খ্যাত তারাই সবচে বেশি অজ্ঞানী। অপরদিকে যাদের জ্ঞানী বলে খ্যাতি কম, তারাই বরঞ্চ অনেক উত্তম ও সত্যিকারভাবে জ্ঞানী। ফলস্বরূপ আমার যাচাই বাচাই, দৈববাণীর মর্মাথের অনুসন্ধান আমার শত্রু বাড়িয়েছে এবং এভাবেই আমার বিরুদ্ধে অপবাদের সুত্রপাত হয়েছে।

 

 

 

হে এথেন্সবাসী, সংক্ষুব্ধগন ব্যতীত অপর সবাই আমাকে জ্ঞানী খেতাবে আখ্যায়িত করে। যারা আমার কথা শুনে তারা ভাবে অপর সকলের মধ্যে যে জ্ঞান নেই, আমার মধ্যে সেই জ্ঞান আছে। কিন্তু এথেন্সবাসি, সত্য কথা হচ্ছে যে, শুধু বিধাতাই জ্ঞানি। অপর কেউ নয়। দৈবজ্ঞ আমাকে জ্ঞানী বলে অবশ্যই এ কথা বুঝাতে চেয়েছেন যে, মানুষের জ্ঞানের মুল্য সামান্যই। দৈবজ্ঞ আমার নামটি শুধু একটি দৃষ্টান্ত হিসাবে ব্যবহার করেছেন। প্রকৃতপক্ষে তিনি তা সক্রেটিস সম্পর্কে বলতে চাননি। এ নামের উল্লেখ করে তিনি যেন বলতে চেয়েছেন: হে মনুষ্যবৃন্দ, তোমরা স্মরণ রেখো, শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী একমাত্র সেই ব্যক্তি যে সক্রেটিসের ন্যায় জানে যে, তার জ্ঞানের মুল্য প্রকৃতপক্ষে কিছুই নয়’। ফলস্বরূপ দৈবজ্ঞের বাণীর প্রতি আমার নিষ্ঠা আমাকে চরম দারিদ্রের মধ্যে নিক্ষেপ করেছে।

 

 

 

কিন্তু যুবসমাজ কেন তোমার পাশে এতো জড়ো হয়? সম্পদশালি শ্রেণীর যুবকগনের তেমন কিছু করার না থাকায় তারা স্বেচ্ছায় আমার কাছে আসতো। ভণ্ড জ্ঞানীদের নির্জ্ঞানতা তাদের কাছে প্রকাশিত হতে থাকে। যুবকরা নের্তৃস্থানীয় ব্যক্তিদের অবাধ্য হওয়ায়, তারা আমার উপর ক্ষেপে যায়। তারা অভিযোগ করেন ‘ আমি যুবকদের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারী, বুদ্ধিভ্রষ্ট, আমি পাপি’। যদি পশ্ন করা হয় সক্রেটিস মন্দ কি শিক্ষা দিচ্ছেন। তারা এর কোন জবাব দিতে পারেনা। অন্যান্য দার্শনিকদের বিরুদ্ধে বলার ন্যায় তারা আমার বিরুদ্ধেও বদনাম বলে বেড়ায়। এ্যনিটাস ও লাইকন উচ্চ শ্রেনীর উচ্চাকাঙ্খী ও উদ্যোগী, তারা আমার বিরুদ্ধে শ্রেনীবদ্ধ হয়েছেন। দ্বিতীয় শ্রেণীর অভিযোগকারীদের পুরোধা হলেন মেলিটাস, দেশপ্রেমিক মেলিটাস। তাদের অভিযোগ ‘সক্রেটিস দুষ্কর্মের নায়ক, তরুনদের বিভ্রান্তকারী, নাস্তিক, নতুন দেবতা সৃষ্টিকারী। দেখুন, মেলিটাস হলফনামায় বলেছেন ‘আমি ঐশ্বরিক শক্তিতে বিশ্বাস করি। আমার বিশ্বস্থ স্বর্গীয় প্রতিভুগণ আধুনিক কিংবা প্রাচীন- সে কথা ভিন্ন। বড় কথা হলো আমি ঐশ্বরিক শক্তিতে বিশ্বাস করি। তাহলে ঐশ্বরিক শক্তিসমুহে বিশ্বাস করেও আমি কিরূপে অবিশ্বাসি বা নাস্তিক হতে পারি। উপ-দেবতাগন তো অবশ্যই দেবতা, কারণ তারা দেবতার সন্তান।

 

 

 

আমি নিশ্চিতভাবে জানি আমার অনুসন্ধান দ্বারা আমি অনেক শত্রু সৃষ্টি করেছি। আমার ধ্বংশ যদি ঘটে তাহলে এই শত্রুতা থেকেই আমার ধ্বংশ হবে। মানুষের কাজ হলো তার নির্দিষ্ট স্থানকেই রক্ষা করা, তাকে পরিত্যাগ করা নয়। হে এথেন্সের ভ্রাতৃবৃন্দ, যে-আমি আপনাদেরই অধিনায়কদের আদেশে পটিডিয়া, এমপিফলিস এবং ডেলিয়ামের যুদ্ধক্ষেত্রে মৃত্যুর মুখে নির্দিষ্ট স্থান পরিত্যাগ করিনি, সে আমি দার্শনিক কর্তব্য পালনে পিছ পা হতে পারিনা। এনিটাসের যুক্তি গ্রহন না করে আমাকে যদি এই শর্তে মুক্তি দেন যে ‘আমি আর বিশ্বের সমস্ত বিষয় সম্পর্কে অনুসন্ধান করবো না- যদি দ্বিতীয়বার আমি এরূপ অনুসন্ধান কাজে লিপ্ত হই, তা হলে মুত্যু নিশ্চিত।’ আপনাদের এরূপ শর্তের জবাবে আমি বলবো— এথেন্সবাসীগন, আমি আপনাদের সম্মান করি ও ভালবাসি। কিন্তু আমার চরম আনুগত্য আপনাদের কাছে নয়। আমার আনুগত্য বিশ্ববিধাতার প্রতি। আমার জীবন থাকা পর্যন্ত কখনই আমি দর্শনের শিক্ষা ও তার প্রচার হতে বিরত হবো না। যার সাথে সাক্ষাৎ হবে তাকেই বলবো জ্ঞান ও আত্মার উন্নয়নের প্রতি নজর না দিয়ে কেবল অর্থ, সম্মান ও খ্যাতির সঞ্চয়ে তোমরা কি লজ্জা বোধ করনা ? সুতারাং আমি বলছি: বিচারপতিগণ, এনিটাস আপনাদের যা করতে বলে আপনারা তাই করুন। আপনাদের যেমন অভিরুচি তেমন সিন্ধান্ত আপনারা গ্রহন করুন। আপনাদের ইচ্ছে হয় আমাকে মুক্তি দিতে পারেন বা দন্ডিত করতে পারেন। কিন্তু একথা নিশ্চিত জানবেন, আপনাদের কোন সিদ্ধান্তই আমাকে আমার গৃহীত পথ থেকে ভ্রষ্ট করতে সক্ষম হবেনা। শুধু একবার নয়, বার বারও যদি আমাকে মৃত্যুবরণ করতে হয়, তাহলেও আমার জীবনের পথ অপরিবর্তিত থাকবে।

 

 

 

এথেন্সবাসীগন! আপনাদের মধ্যে যারা আমাকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেছেন তারা আমার ভবিষ্যতবাণী শ্রবণ করুন। মৃত্যুর মুখোমুখি যে দাঁড়িয়ে আছে তার মধ্যে ভবিষ্যতবাণী করার একটি ক্ষমতা জন্ম লাভ করে। সেই শক্তিতেই আমি বলছি: আমার হত্যাকারীগণ! একথা নিশ্চিত জেনো, মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করে আমাকে যে শাস্তি দিতে তোমরা সক্ষম হয়েছো, আমার তিরোধানের সঙ্গে সঙ্গে তার চেয়ে কঠিনতর শাস্তি তোমাদের উপর নিপতিত হবে। বয়সে তরুন যুব সম্প্রদায় তোমাদের উপর অধিকতর ক্ষুব্দ হবে। শেষ মুহর্তে আপনাদের নিকট আমার একটি যাঞ্চা রয়েছে। আমার প্রার্থনা, আমার পুত্রগণ যখন বয়োপ্রাপ্ত হবে তখন তাদেরও যেন আপনারা দণ্ডিত করেন। বিদায় মুহূর্ত সমাগত! আসুন আমরা আপন আপন পথে অগ্রসর হই। আমি অগ্রসর হই মৃত্যুর পথে। আপনারা অগ্রসর হউন জীবনের পথে। কোন পথ মহত্তর? জীবনের কিংবা মৃত্যুর? বিশ্ববিধাতাই তার জবাব দিবেন।

 

 

 

ড. বাসার মোহাম্মদ শফিউল্লাহ

২৬ জানুয়ারী, শুক্রবার, ২০২৪ খ্রি.

———————————–
  মৃত্যু জীবনের চেয়ে মহান 
———————————–

কারা অভ্যন্তরে এত প্রত্যুষে তুমি কেমন করে প্রবেশ করলে, ক্রিটো! এতো অবাক করা কাণ্ড। আমাকে নিদ্রা থেকে না জাগিয়ে তুমি নিরবে বসেছিলে কেন?। ভাবছিলাম, নিশ্চিত মৃত্যুদণ্ডের কথা জেনেও একজন মানুষ কিভাবে ঘুমাতে পারে! এতে বিস্ময়ের কি আছে, বন্ধুবর? মৃত্যুর আগমন দেখে আমার মত সত্তোরোর্ধ বৃদ্ধের কি দু:খ পাওয়া উচিত? এবার বলো, এত প্রতুষে কেন কারাকক্ষে প্রবেশ করলে ? ডেলসের যে জাহাজটি আগমনের পর আমার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার কথা, সে কি বন্দরে পৌঁছে গেছে? না, বন্দরে এখনও পৌঁছাইনি। তবে সে জাহাজ অদ্যই এসে পৌঁছাবে। ‘ হায় ঈশ্বর, আগামী দিনটিই তোমার জীবনের শেষ দিন’। বেদনায় ক্রিটোর চোখ থেকে কয়েক ফোটা জল ঝরে পড়লো। সক্রেটিস ক্রিটোকে শান্তনা দিয়ে বললেন, দু:খ পেও না, বন্ধু। পরমেশ্বর যদি এমনই ইচ্ছাই করে থাকেন তাহলে আমি তার জন্য সর্বদা প্রস্তুত রয়েছি। কিন্তু আমার বিশ্বাস মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হতে একদিন বিলম্ব হবে। গতরাতে আমি স্বপ্নে দেখলাম শুভ্রবসন পরিহিতা শান্ত-সৌম্য এক নারীমুর্তি আমাকে আহবাণ করে বলছেন ‘ আজ থেকে তৃতীয় দিবসে তুমি উর্বর পিথিয়াভুমির উদ্দেশ্যে যাত্রা করবে।’ হ্যাঁ, এ স্বপ্নের তাৎপর্য খুবই স্পষ্ট।


আমার শেষ অনুরোধ তুমি রক্ষা করো। আমাদের জন্য চিন্তিত হয়ো না। তোমাকে সঙ্গোপনে মুক্ত করার জন্য এথেন্সের অনেক নাগরিক প্রস্তুত আছে। প্রহরিগনের উৎকোচের দাবীও তেমন অধিক কিছু নয়। তুমি কি এই ভেবে উদ্বিগ্ন হচ্ছো বন্ধু, হয়তো সরকার আমাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করবে অথবা আরও কঠিন দণ্ডে আমাদের দণ্ডিত করবে। আমার অর্থ ব্যয়ে তোমার অনিহা থাকলে, থিবের সিমিয়াসের সাহায্য নিতে পার, তিনি অনেক অর্থ সংগ্রহ করেছেন। সিবিস ও অন্যান্য নাগরিকগণও তোমার পলায়নে সাহায্য করার জন্য তাদের সমস্ত সম্পদ ব্যয় করতে প্রস্তুত আছেন। তোমার মৃত্যুতে শুধু আমাদেরই অপূরণীয় ক্ষতি হবেনা- সাথে সাথে অন্যান্য বিপদ ও বিপর্যয়ও দেখা দিবে। মানুষ বলবে ক্রিটো অর্থ ব্যয় করলেই সক্রেটিসকে বাঁচাতে পারত। কিন্তু অধিকাংশ লোক এ কথা কোন দিন জানবে না যে, আমি তোমাকে কারাগার থেকে পলায়ন করার অনুরোধ করেছিলাম। প্রিয় সক্রেটিস, সে কাজ আজ রাতেই সম্পন্ন করতে হবে। যে ঐশ্বিক শক্তি আমার সকল প্রেরণার উৎস, যে অর্ন্তরবাণী সারা জীবন আমাকে পথ দেখিয়েছে, সে বলছে ‘ সক্রেটিস, তুমি পালিয়ো না’। মৃত্যুকে মঙ্গল হিসাবে দেখাই যুক্তি সঙ্গত। কেননা ‘ হয় মৃত্যু এক অসীম শূণ্যতা এবং চেতনার অবলোপ’ নয়তো মানুষ যেমন কল্পনা করে যে, মৃত্যু হচ্ছে এক জগৎ থেকে অপর জগতে আত্মার পরিভ্রমন। সুতারাং আমি মৃত্যুকে যদি একটি ব্যাঘাতবিহীন নিদ্রা বলে মনে করি যা স্বপ্ন দ্বারাও বিঘ্নিত নয়, তাহলে তা এক অবর্ণনীয় প্রাপ্তি। আবার মৃত্যু যদি মৃতের রাজ্যে গমন হয় তাহলে আমি নীত হবো মিনোস, ইকাস, রাডামেন্টাস ও অপরাপর দেব-পুত্রদের সম্মুখে। যদি সেখানে কবি হোমার, অরফিউস ও অন্যান্য দেব-পুত্রদের সঙ্গ পাই বিনিময়ে আমার অদেয় কিইবা থাকতে পারে। এ যদি সত্য হয়, তাহলে আমি বলবো: একবার নয়, শতবার যেন আমার মৃত্যুদণ্ড হয়।


এথেন্সের অনেক বীর সন্তানদের মৃত্যু হয়েছে অন্যায় দণ্ডে। আমি তাদের সঙ্গে বাক্যালাপ করতে পারবো। এ আমার পরম সৌভাগ্য। বন্ধুবর, ‘ তুমি আমাকে পরমেশ্বরের হাতেই অর্পন করে যাও। তার ইচ্ছাই পূর্ণ হউক। তাঁরই আদিষ্ট পথ আমাকে অনুসরন করতে দাও।’ শেষ স্নান সেরে আসলে কারানিয়মে সক্রেটিসের পায়ের শিকল খুলে দেয়া হলো। দ্বাদশ প্রভুর পরিচারক হিসাবে কারাপাল উপস্থিত হলেন। কারাপাল কক্ষমধ্যে সক্রেটিসের পাশে দাঁড়িয়ে বলতে লাগলেন। ‘ প্রিয় সক্রেটিস, যত বন্দি এ পর্যন্ত এ কারাগারে আনীত হয়েছে তাদের মধ্যে আপনার ন্যায় উত্তম, মহৎ এবং নম্র কেউ কখনও ছিল না। আমি কর্তৃপক্ষের আজ্ঞাবাহক। মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত বন্দির মুখে বিষভাণ্ড তুলে দেয়াই আমার কাজ। আমার প্রতি বিরাগভাজন হবেন না। আমি আপনাকে শুধূ এই বলবো আপনি যেন ‘সব অনিবার্যকে সহজভাবে গ্রহন করেন।’ এই বলে কারাপাল বিদায় নিলেন। কিছুক্ষণ পর কারাপাল বিষভাণ্ড নিয়ে ফিরে এলে সক্রেটিস কারাপালকে লক্ষ্য করে বললেন ‘ দয়া করে বলুন, কিভাবে আমি অগ্রসর হবো। প্রথমে কারাভৃত্য তাঁকে নির্দেশনা দিলেন, তিনি যেন বাক্যালাপ কম করেন, কারন অতিরিক্ত বাক্যালাপ দেহে তাপ সৃষ্টি করে ফলত অনেক সময় শুধু দুইবার নয়, এমন কি তিনবারও বিষ প্রয়োগ করতে হয়। অতপর কারাপাল সক্রেটিসকে লক্ষ্য করে বললেন ‘ বিষপানের পর আপনি আস্তে আস্তে পায়চারি করবেন। পদচারনায় যখন আপনার পদদ্বয় ভারী হয়ে আসবে কেবল তখনই আপনি শায়িত হবেন। তা হলে বিষক্রিয়া সঠিকভাবে চলতে থাকবে’ একথা বলে কারাপাল তাঁর হাতে বিষভাণ্ড তুলে দিলো। ধীর-শান্তভাবে তিনি কারাপালকে বললেন ‘এই পিয়ালা থেকে দেবতাদের উদ্দেশ্যে আমি কি কিছু বিষ উৎসর্গ করতে পারি ? কারাপাল বললেন ‘সক্রেটিস, আমরা তো কেবল ততটুকু বিষই তৈরী করি যতটুকু প্রয়োজন বলে বোধ হয়। তার অতিরিক্ত নয়’।


বুঝতে পারছি বন্ধু, তাই হোক। আমি কেবল আমার পরমেশ্বরকে ডেকে বলছি, ‘এ-লোক থেকে ও-লোকে আমার যাত্রাটিকে নির্বিঘ্ন করে দাও, আমার এ প্রার্থনাটি মন্জুর হোক।’ বলে নিজ মুখে বিষ ঢেলে দিলেন। নিজ হাতে বিষপানের এই দৃশ্য দেখে ফিডো, ক্রিটো ও অন্যান্যরা কাঁদতে শুরু করলেন। এ্যপলোডোরাস সর্বক্ষণই ক্রন্দনরত ছিলেন। এবার তিনি সশব্দ আর্তনাদে ভেঙ্গে পড়লেন এবং জোরে জোরে চিৎকার শুরু করলেন। সক্রেটিস নিবির্কিার ও শান্ত। তিনি বলে উঠলেন, কী অদ্ভুদ তোমাদের ক্রন্দন। আমি তো মেয়েদের এ্জন্যই পাঠিয়ে দিলাম যেন এরূপ দৃশ্যের অবতারণা না হয়। ‘তোমরা শান্ত হও, ধৈর্য ধারন কর।’ এক পর্যায়ে তার পা দুটি অবশ হয়ে আসছে। নির্দেশমত তিনি শুয়ে পড়লেন। কারাপাল পায়ের তলদেশে বার বার চাপ দিচ্ছেন, কিন্তু তিনি কোন চাপ অনুভব করছেন না। বিষক্রিয়া ক্রমান্বয়ে হৃদযন্ত্রের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। কিছুক্ষণ পরেই তাঁর অন্তিম মুহুর্ত উপস্থিত হবে। কিছুক্ষণ আগে নিজ হাতেই কাপড় দিয়ে তার মুখখানা ঢেকে দিয়েছিলেন। পরমুহুর্তেই মুখের আচ্ছাদন সরিয়ে নিয়ে বললেন ‘ ক্রিটো, এ্যাসক্লেপিয়াসের নিকট আমার একটি ঋন রয়েছে, তুমি তা পরিশোধ করে দিও’। বলে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করলেন।


ড. বাসার মোহাম্মদ শফিউল্লাহ
 ৯ ফেব্রুয়ারী, ২০২৪ খ্রি.

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipiscing elit. Ut elit tellus, luctus nec ullamcorper mattis, pulvinar dapibus leo.

Scroll to Top